অয়ন’রা আসে না

শফিক আহমেদ প্রায় প্রতিদিন গল্প শোনায় তার বন্ধুকে। বন্ধুটি প্রবল মনযোগী শ্রোতা। এই বন্ধু দুইজনের জন্ম তারিখ একই মাসের এক তারিখ এবং অন্যজনের আঠারো তারিখ। তবে বয়সের পার্থক্য সাইত্রিশ বছর। তবুও প্রকৃতি তাদের বেঁধেছে বন্ধুত্বে। শফিক আহমেদ যখন গল্প বলতে শুরু করেন অন্যজন অপলক হয়ে তা গলাধঃকরণে ব্যস্ত থাকে।
শফিক আহমেদের এই বন্ধুটির নাম অয়ন। অয়ন পড়ে সপ্তম শ্রেনীতে। অয়নের খুব পছন্দের একজন মানুষ শফিক আহমেদ। অবশ্য পছন্দের মূল কারণ গল্প। যুদ্ধের গল্প। অয়ন তার কাছ থেকে শোনে মুক্তিযুদ্ধের গল্প। শফিক আহমেদ একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা।
স্বাধীনতার এক যুগ পেড়োতে না পেড়োতে দেশ ইতিমধ্যে একজন একজন করে দেশের অসামান্য সম্পদ হারিয়েছে। আসলে যারা দেশের জন্য দুর্দান্ত কিছু একটা করার চেষ্টা করেছিল তাদেরকেই চিরতরে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান, শহীদ রাষ্টপতি জিয়াউর রহমান, কর্ণেল আবু তাহের, মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর সবাই এক এক করে হারিয়ে যেতে বাধ্য হলেন। দেশের হাল ধরবার মত যোগ্য একজন নেতা খুব জরুরী। কেউ জানেনা কি অপেক্ষা করে আছে। দেশ শত্রুমুক্ত হলেও স্বাধীনতা শত্রুমুক্ত হয়নি। স্বাধীনতা দেখতে হয়েছে পেন্ডুলামের মতন।
শফিক আহমেদ যুদ্ধ করেছিলেন বরিশাল অঞ্চলে। তখন বরিশালে হানাদারদের বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন কে? প্রশ্নটি করলে একজনের নাম সামনের কাতারে এসে যায়, সিরাজ সিকদার। ২৫শে মার্চের পরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে ব্যাপক সংগ্রাম গড়ে ওঠে। তবে তার প্রস্তুতি ছিল অনেকদিনের। তিনি বরিশাল পেয়ারাবাগান এলাকায় গড়ে তোলেন জাতীয় মুক্তি বাহিনী। হানাদারদের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয় তার বাহিনী। শফিক আহমেদও কাছা মেরে পথে নামে।
শফিক আহমেদ এক বোমার আঘাতে ছিন্ন হয়ে উড়ে যেতে দেখে তার পা দু’টোকে। প্রচন্ড রক্তক্ষরণের পরে সে যে বেঁচে আছে তার নিজের কাছেই মাঝে মাঝে বিস্ময় ঠেকে। তার শরীরের সাথে ঝুলে থাকা দুই পায়ের অবশিষ্টাংশ পড়ে কেটে ফেলে দিতে হয়। শফিক আহমেদের সাথে অনেকদিন যোগযোগ ছিল মেজর এম এ জলিলের। মুক্তিযুদ্ধে তার অনেকটা সময় কেটেছে মেজর এম এ জলিলের অধীনে। তিনি কদাচিৎ ভুলে থাকেন দিনগুলো। তারা ২৪শে এপ্রিল পর্যন্ত পটুয়াখালীকে মুক্ত অঞ্চল করে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। খুলনায় রেডিও অফিস মুক্ত করার অপারেশন কিংবা সুন্দরবন গমন। আজও স্পষ্ট হয়ে হেঁটে ফেরেন দিনগুলোতে।

অয়ন পড়ে প্রভাতী শাখায়। বিদ্যালয় থেকে ফিরে আসে বেলা বারোটার পরপর। গোসল শেষ করে দুপূরের খাবার খেয়ে তার ঘুমানোর নিয়ম। এক থেকে দেড় ঘণ্টা ঘুমিয়ে উঠে তাকে এক থেকে দেড় ঘণ্টার জন্য পড়তে বসতে হয়। পড়া শেষ করে খেলার সময় ঘনিয়ে এলে সে চলে আসে শফিক আহমেদের কাছে গল্প শুনতে। বাসায় ঢুকেই প্রথম যে কথাটি সে শফিক আহমেদকে বলে তা হল “কেমন আছো?” শফিক আহমেদ হেসে উত্তর দেন “ভাল”। অয়নের পরবর্তী প্রশ্ন বলে “আজ কোন অঞ্চলের গল্প শুনবো?” তারপর তারা বাড়ীর বারান্দায় গিয়ে বসে, শুরু হয় গল্প বলা এবং শোনা।
শফিক আহমেদ বসবাস করেন তার বড় ভাইয়ের সাথে। বড় ভাই রফিক আহমেদ চাকরি করেন সরকারের পরিকল্পনা কমিশনে। সে, তার স্ত্রী এবং শফিক আহমেদ এই তিন জনই তাদের পরিবারের সদস্য। শফিক আহমেদের আলাদা সংসার নেই। মুক্তিযোদ্ধা হলেও পঙ্গুর কাছে কেউ মেয়ে বিয়ে দেয় না। শফিক আহমেদেরও কখনও ইচ্ছে জাগেনি বিয়ে করার। তার মা যতদিন বেঁচে ছিলেন মাঝে মাঝে বিয়ের কথা বলাবলি করতেন। শফিক আহমেদও বারবার একই উত্তর দিতেন “কি দরকার আর একজন মানুষের বোঝা বাড়ানো!”
রফিক আহমেদ কোন একটি অজানা কারণে সন্তানহীন। তা সত্ত্বেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন মনোমালিণ্য নেই। সঠিক ভালবাসা থাকলে যা হয়, সব সমস্যার পরেও দু’জন মিলে একটি সমাধান তারা বের করে নেন। এই পরিবারটি আগে থাকত মিরপুরে। রফিক আহমেদ সরকারী অ্যালোটমেন্ট নিয়ে এখন বাস করছে মোহাম্মদপুরে। রফিক আহমেদের স্ত্রী শিরীন নিজ দায়িত্বে দেখভাল করেন শফিক আহমেদের।
মোহাম্মদপুরের বাসায় আসার আগে ও পরে শফিক আহমেদের সময় কাটত বই পড়ে অথবা বাসার বারান্দায় বসে থেকে। ইদানিং সে মাঝে মাঝে লেখালেখি করার চেষ্টা করছেন। মন মত কিছুই হয়ে উঠছে না। কখনও সখনও দুই একজন বন্ধু আসে তাদের সাথে কিছু কথাবার্তা হয়। এই তার পৃথিবী।
তবে শফিক আহমেদ এখনও একটি স্বপ্ন দেখে জেগে ওঠেন গভীর রাতে। গলা শুকিয়ে আসে তার। ঢোক গিলতে পারেন না। বসে থাকেন অনেকক্ষণ ধরে। যুদ্ধের সময় একবার খবর এলো পাক বাহিনী আগমনের। আস্তানা পাল্টাতে হবে। গভীর রাতে শফিক আহমেদ ও সে যে মুক্তিবাহিনী দলের যোদ্ধা ছিলেন সেই দল একটি নৌকায় চড়ে আস্তানা পাল্টাচ্ছিলেন। তারা বদরখালী ইউনিয়ন পরিষদের অন্য একটি আস্তানায় যাচ্ছিলেন। বিশখালী নদী দিয়ে অনেক ভিতরে ধুকে এলেন। সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। ফিসফাস কথা ছাড়া চারপাশ নিস্তব্ধ। কিন্তু তারা যত এগিয়ে যাচ্ছেন নিস্তব্ধতা তাল মিলিয়ে বেড়েই চলছে। নিস্তব্ধতা যত বেড়ে যেতে থাকে সমানতালে তাদের নিজেদের মধ্যে কথাবার্তাও নিভু হয়ে আসে। খুব ধীরে ধীরে যতটুকু পারা যায় শব্দহীন হয়ে এগিয়ে যেতে থাকে তাদের বাহন।
নৌকার সামনের দিকে বসে আছেন শফিক আহমেদ। হাতে টর্চ লাইট। তাদের দলনেতা মোতালেব মুন্সী হঠাৎ শুনতে পেলেন দূরে কোথাও থেকে চিৎকার ভেসে আসছে। হ্যারিকেনের নিভু আলোয় একজন অন্যজনের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন। সবাই-ই শুনতে পেরেছেন। হ্যারিকেনের আলো বন্ধ করে দেয়া হল। তাদের নৌকা সোজা সামনে অনেকদূর এগিয়ে বাম দিকে চলে যাওয়া খালে ঢুকলো। শফিক আহমেদ বসে নৌকার সামনে। খেয়াল করলেন সারাটা গ্রাম এখানে ভূতুড়ে হয়ে আছে। কোথাও কোন আলো জ্বলছে না। আরও মিনিট পাঁচ সামনে এগিয়ে গেলে বেশ দূরে দাঊদাঊ করে আগুন জ্বলে উঠল। বোঝা গেল পাকবাহিনীর অস্তিত্ব। সবার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে দূরে জ্বলতে থাকা কুড়ে ঘরের আগুনে। একটু পরে পাশের আরও একটি ঘরে আগুন জ্বলতে দেখা গেল, তারপর আরও একটি। সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে ঘরগুলো একে একে বুক ফুলিয়ে আগুন বরণ করে নিচ্ছে। নৌকা তিরতির করে এগিয়ে যেতে থাকে। বারোজন যোদ্ধা অপেক্ষা করছে দলনেতা মোতালেব মুন্সীর আদেশের অপেক্ষায়। সবাই প্রস্তুত। শুধু ইশারার অপেক্ষা। এমন সময় পানি থেকে ‘চুউব’ একটি শব্দ এলো। শফিক আহমেদ হাতের টর্চ থেকে আলো পানিতে ফেললেন। ধরে রাখলেন কিছুক্ষণ। পানিতে মৃদু ঢেউ দেখলেন আর তেমন কিছু পেলেন না, হয়ত ব্যাঙ ছিল, হয়ত বড় কোন মাছ ছিল। মুখ না ঘুরিয়েই দলনেতাকে জানালেন “ঠিক আছে”।
শফিক আহমেদ কিছু একটা ভেবে আবার আলো জ্বেলে পানিতে ফেললেন। আর যা দেখলেন তাতে “আআহ” বলে ক্ষীণ একটা অস্ফুট চিৎকার করে উঠলেন ভয়ে। একটি ভেজা চুলের মাথা দুইটি ভীতু জ্বলজ্বলে চোখ করুণ দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
একটি মেয়ে সেখানে। মেয়েটি শুধু পানি থেকে চোখ দুটো বের করে আছে আর মাঝে মাঝে নাক উঁচিয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। শফিক আহমেদ সামনে ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে দেয় মেয়েটিকে নৌকায় উঠে আসার জন্যে। মেয়েটি অসম্মতিসূচক মাথা নেড়ে ‘না’ জানায়। তিনি দুই-তিন বার উঠে আসার জন্যে বলে হাত বাড়িয়েই রাখলো। মেয়েটি তবুও উঠে এলো না। অন্ধকার রাতে পানি ছেড়ে নৌকায় উঠে আসতে না চাওয়ার কারণ হঠাৎ অনুধাবন করতে পেরে তিনি নৌকায় রাখা পোটলা থেকে তার একটি শার্ট আর একটি লুঙ্গি মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিয়ে টর্চ বন্ধ করে দিলেন। অল্পপরেই শফিক আহমেদ নৌকা থেকে ঝুলে থাকা নিজ হাতে মেয়েটির হাতের স্পর্শ পেলেন। উঠিয়ে নেয়া হল মেয়েটিকে।
দ্বিতীয়বার ধর্ষণ হওয়া থেকে রক্ষা পেতে মেয়েটি খালের পানিতে লুকিয়ে ছিল।
আজও করুণ চোখ দু’টো এসে স্বপ্নে হানা দেয় শফিক আহমেদকে। শফিক আহমেদ ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে হাত বাড়িয়ে দিতে চান সামনের দিকে ঝুঁকে। সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছেন তিনি অনেকদিন। ধীরে বাস্তবে ফিরে আসেন। তার দুটি পা নেই।

মোহাম্মদপুরের বাসায় আসার পর একদিন শফিক আহমেদ বসে ছিলেন বাসার বারান্দায়। সামনের রাস্তায় ছেলেরা বল খেলছে তাই দেখছিলেন। এমন সময় একটি বল এসে পিছনের দেয়ালে লেগে তার হুইল চেয়ারের নীচে চলে যায়। একটি ছেলে এসে বলে, “বলটা একটু দেবেন?” শফিক আহমেদ বলেন, “এই চেয়ারের নীচে আছে নিয়ে যাও।” ছেলেটি বল নিয়ে হাতে দাঁড়িয়ে অবাক চোখ নিয়ে মাথা তুলে জিজ্ঞেস করে “আল্লাহ! তোমার একটিও পা নেই?” ছেলেটির চোখে মুখে আতঙ্ক দেখে শফিক আহমেদ হেসে বলেছিল “না নেই, কেটে ফেলেছি।”

এই ছিল শফিক আহমেদের এবং অয়নের পরিচয় পর্ব। তারপর আরও অনেক কথা ও প্রশ্ন ছিল অয়নের।
কিভাবে হল?
কেন হল?
কারা করল?
কেন করলো?
মুক্তিযুদ্ধ?
এটা কি?
আমাকে বলবে?
সব বলবে?
কাল থেকে আসবো।
আরও অনেক কথা। শফিক আহমেদ সব কথার উত্তর দিতে থাকেন হাসি মুখে। তার মনে হতে থাকে নিজের সন্তানাদি না থাকলে আসলে পরিপূর্ণ ভাবে বোঝা যায় না সন্তানাদির মায়া কতখানি হতে পারে।
অয়ন মোটামোটি যা নিতে পারবে শফিক আহমেদ সেসব কিছু বলার চেষ্টা করেন। অনেক কিছু অয়নের মাথায় ঢোকেও না। তাকিয়ে থাকে শুধু। শফিক আহমেদ তবুও বলতে থাকেন, একদিন ঠিকই বুঝে যাবে এই বালক। ১৭ মার্চ ঢাকার সামরিক জান্তার জেনারেলদের বৈঠক এবং বাঙালী হত্যার নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ কথা, ২০ মার্চ তারিখে লে. জেনারেল আব্দুল হামিদের ফ্লাগ স্টাফ হাউসে টিক্কা খানের সঙ্গে বৈঠক এবং ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ অনুমোদনের কথা। ২৫শে মার্চ রাতের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর কথা। ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইট নামে সমগ্র ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করার ঘটনা ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কয়েকটি সুসজ্জিত দল ঢাকার রাস্তায় নেমে পরিচালিত পরিকল্পিত গণহত্যা, যার মাধ্যমে তারা ১৯৭১ এর মার্চ ও পূর্ববর্তী সময়ে সংঘটিত বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করতে চেয়েছিল। শিক্ষক, ছাত্র, কর্মকর্তা, কর্মচারী কেউ বাদ যায়নি। কিভাবে এতগুলো মানুষকে বিনা কারণে মেরে ফেলা হয় সেই ঘটনা। কিভাবে ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস হল একটি গণহত্যার রাত অতিক্রম করে। ১৮ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন হওয়ার ঘটনা। তাজউদ্দীন আহমেদ নামে আমাদের এক মহান নেতার কথা। যিনি খুব ভাল ভাবে জানতেন কিভাবে মুখ বন্ধ রেখে দেশকে দিয়ে যেতে হয়, নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয়। জুলফিকার আলী ভুট্টো যাকে শেখ মজিবুর রহমানের পিছনে ফাইল হাতে বসে থাকা ‘নটোরিয়াস’ লোক বলে ডাকতেন। বীর শ্রেষ্ঠদের কথা, বীর উত্তমদের কথা, বীর প্রতীকদের কথা।
কখনও শফিক আহমেদ চলে যেতেন আরও পেছনের অতীতে। ২১ শে ফেব্রুয়ারীর গল্পে। ভাষা শহীদদের গল্পে কিংবা ভাষা সৈনিকদের গল্পে। অয়ন অনেক কথা বুঝতো না। তবুও চুপচাপ শুনে যেত। ওর বেশী ভাল লাগতো গোলাগুলির গল্প। মুক্তিযোদ্ধারা কিভাবে হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধে মেতেছিল। দেখে মনে হত এক নিঃশ্বাসে শুনে যাচ্ছে। গল্পের মাঝে যখন কোন বাচ্চা ছেলেমেয়ের না খেতে পেরে রাস্তার পাশে পরে থাকার গল্প আসতো কিংবা পাকিস্তানী হানাদারের গুলিতে নিহত হওয়া শিশু ছেলেমেয়ের গল্প হত অয়ন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠত। শফিক আহমেদ কখনও কান্না থামানোর কথা বলতেন না। গল্প বলে যেতেন শুধু। কখনও মনে মনে বলতেন “এই কান্না তোমাকে দিয়ে তোমার দেশকে ভালবাসতে শেখাবে।”
সেদিন শফিক আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের একটি বিশেষ অধ্যায় বলছিলেন অয়নকে। সেদিনই প্রথম রাজাকারের ঘটনা বলা শুরু করেছেন। কিভাবে রাজাকাররা এই দেশটাকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। একজন বাঙালী হয়ে এই কাজ করা কতখানি ঘৃন্য তা বোঝাচ্ছিলেন। তাদের কিরকম শাস্তি হওয়া উচিত তাও বলছিলেন শফিক আহমেদ।
এমন এক পর্যায়ে “অয়ন” “অয়ন” বলে কাউকে ডাকতে শোনা গেল। অয়ন বারান্দা দিয়ে দেখে “চাচ্চু” বলে শফিক আহমেদকে বলল “আজ যাই”। শফিক আহমেদ ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিলে অয়ন সামনে এগিয়ে গেল। বাড়ীর মূল ফটকে দাঁড়ানো পরিপাটি শার্ট প্যান্ট পায়ে শু পরিহিত লোকটিকে দেখতে ভালই লাগছিল শফিক আহমেদের। চকচক করছে শু জোড়া। লোকটির দুই পায়ে মানিয়েছে বেশ। অয়ন লোকটির সামনে গিয়ে কিছু একটা বলতে লোকটি মুখ ঘুড়িয়ে তাকাতে তাকে চিনতে অসুবিধা হয় না। লোকটিও শফিক আহমেদকে চিনে নিল নিমিষে। এইসব লোক কাউকে ভোলে না।
লোকটি চলে যাওয়ার সময় শফিক আহমেদের পায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে অয়নকে নিয়ে প্রস্থান রচনা করে। ততক্ষণে শফিক আহমেদের ইচ্ছা হয় ছুটে গিয়ে লোকটির টুটি টিপে ধরতে। রাগে ক্ষোভে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। হায় তা আর এই পৃথিবীতে সম্ভব না। নিজের মনে চিৎকার করে ওঠে “শুয়োরের বাচ্চা” “রাজাকারের বাচ্চা”। এই প্রথম হারানো পা দুটোর জন্যে আফসোস হতে থাকে শফিক আহমেদের।
পরদিন সকাল থেকে শফিক আহমেদ অপেক্ষা করতে থাকে অয়ন কখন আসবে। আর যাই হোক অয়নকে রাজাকারের গল্পটুকু তাকে বলতেই হবে। ঘড়িতে সকাল এগারোটা বাজলে তার অপেক্ষার প্রহর গোনা তীব্র হয়। বারোটা বাজে, তিনি মনে মনে বলেন এইতো এখন বাড়ী ফিরবে অয়ন। এক’টা বাজলে তিনি মনে মনে বলেন অয়ন এখন ঘুমাবে, ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসবে তারপরই চলে আসবে। অয়নকে আজই রাজাকারের কার্যকলাপ সব বলে ফেলবেন ওর বয়স অনুযায়ী যতটুকু বলা যায়। দুপূর তিনটে বাজলে তিনি ভাবেন এইতো তিনটা বেজে গেছে আর কিছুক্ষণ, অয়ন এখন পড়ছে। বিকেল হয়ে যায়। অয়নের আসার সময় হয়ে যায়। শফিক আহমেদ কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করেন। ঘড়ি দেখেন। অয়নের আসার সময় হয়ে গেছে। একবার ভাবেন, তারপর তিনি মনস্থির করেন অয়নকে বলে দেবেন তার এই চাচা একজন রাজাকার। শফিক আহমেদ বারান্দায় হুইল চেয়ারে বসে প্রহর কাটান।
সময় পাড় হয়ে যায়। অয়ন আসে না। শফিক আহমেদ বারান্দায় বসে অয়নের জন্য অপেক্ষা করেন। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়। অয়ন ঐদিন আর আসে না। শফিক আহমেদ শান্ত করেন নিজেকে, বলেন, “আজ নয়ত কি হয়েছে? কালকে তো আসবে। কালকে বলবো সব”।
কালও চলে যায়। পরশুও একই ভাবে কেটে যায়। অয়ন আসে না। শফিক আহমেদের বোধগম্য হয় সব। তারপর সপ্তাহ চলে যায়। শফিক আহমেদ প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হুইল চেয়ার নিয়ে ঘরে ফিরে আসেন বারান্দা ছেড়ে।
যেদিন মাস শেষ হয়ে যেতে বাধ্য হয়, সেদিনও অয়ন আসে না। মুক্তিযুদ্ধের অনেক অনেক ইতিহাস অয়নকে জানানো হল না। সেদিনও শফিক আহমেদ বারান্দায় অপেক্ষারত। দিনের আলো ফুঁড়িয়ে এলে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন “আল্লাহ, রহম করেন, এই জাতিকে রক্ষা করেন।”

© Shihab Shahariare Khan || developed by digibinary ||