হনুমান


ভাত শালিক দুইটির মধ্যে খুব প্রেম। তবে কোনটি পুরুষ আর কোনটি নারী দেখে বোঝার কোন উপায় জানা নেই। দুইটির মুখ দেখতে একই রকম। হলুদ ঠোঁট, ঠোঁটের গোঁড়া সামান্য বাদামি-সবুজ। পায়ের পাতাসহ পা আর নখর হলুদ রঙের। তবে অনেকক্ষণ দেখতে থাকলে শুধুমাত্র আকৃতিতে ঠাহর করা যায় পুরুষ শালিক কোনটি আর নারী কোনটি। একটি অন্যটির পিছনে টিং টিং করে লাফিয়ে চলছে, ধরে ফেলার ভান করছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরছে না। হাসপাতালের বারান্দায় অপেক্ষারত অবস্থায় থেকে এসবই খেয়াল করছে নুরু। দাঁতের গোড়ায় ব্যাথা নিয়ে আজ দুইটি দিন কেটে গেল সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বারান্দার লম্বা কাঠের আসনে হেলান দিয়ে, ঝিমিয়ে। কিছুটা উদ্বিগ্নতায় আর কিছুটা নিজের প্রতি অবহেলায়।

সামনে দিয়ে এক লোক তার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে যেতে যেতে ঠেসে গালে চুমু দিতে দিতে চলে গেল। লোকটির পোষাক আষাক নুরুর পোষাক আষাকের তুলনায় ঢের ভাল। নুরু সেদিকে তাকিয়ে লোকটির চলে যাওয়া দেখলো, তারপর নিজের গায়ের জামার দিকে তাকালো একবার। শুকনোভাবে মুচকি হাসলো। তার আব্বা তাকে কখনও তার গালে ঠোঁট লাগিয়েছিলো কিনা মনে করতে পারলো না। বরঞ্চ ঘণ্টায় ঘণ্টায় তাকে পিটাতে পারলে হয়ত শান্তি পেত। আব্বা মারা গেছে প্রায় এগারো বছর তবু এখনও নুরুর তাই-ই মনে হয়। অন্যদিকে আম্মা আড়াল করে রাখতো নুরুকে। আব্বার কাছে থেকে, বাইরের মানুষের কাছ থেকেও। নুরু আবারো হাসলো, এখন আগলে রাখার কেউ নাই, আড়াল করারও কেউ নাই।
নুরুর সাথে তার আব্বার শত্রুতা শুরু হয় নুরু জন্মের দিন থেকে। নুরুর আব্বা তার জীবনে এমন কালো গায়ের রঙের ছেলে কখনও দেখেনি। আজ পর্যন্ত দেখেনি নুরুও। সে লোকমুখে শুনেছে প্রথমে নাকি তার আব্বা মানতেই চায়নি যে এটি তার সন্তান। এমনকি ছেলের নাম রাখার সময় সে ছেলের নাম রাখতে অস্বীকৃতি জানায়। নুরুর নাম রাখে তার মা। নূর থেকে নুরু। কালো জগতের আলো।

একজন নার্স এসে জানায়, আপনি তো ছেলের বাবা হয়ে গেলেন। ছেলে মনে হয় আপনার মতই হবে। আপনার স্ত্রীকে একটু অবজার্ভেশনে রাখা হয়েছে। আল্লাহকে ডাকেন – দোয়া করেন, ঠিক হয়ে যাবে সব ইনশাল্লাহ।
পাশ দিয়ে কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে দাঁত বের করা হাসিতে একজন আয়া বলে যায়, পোলা হইছে, আমাগো বকশিস দিতে হইবে কিন্তু।
নুরু খুশিতে কোন কথা বলতে পারেনা, উত্তরে শুধু এক গাল হাসে। বাপ হয়ে গেল! একটু কেমন কেঁপে ওঠে তার শরীর।

নুরু আবার আব্বার কথা মনে করে, ভাবে। একটু কষ্টও হয়। আব্বা কোনদিনই তাকে সন্তান হিসেবে মানতে পারে নাই। সারাদিন রিক্সা চালিয়ে ফিরে এসে খারাপ ব্যবহারটা নুরুর সাথেই করতো। মারধর করতো। নুরুর মাকে সন্দেহ করা শুরু করে শেষ বয়সে। কখনও সখনও নুরুর জন্ম নিয়ে বাপ নিয়ে তার সন্দেহ উগড়ে দিত। মা বরাবরই সামনে দেয়াল হয়ে থাকার চেষ্টা করতো।
আব্বার মত পারে নাই বস্তির পড়শিরাও। নুরুর গায়ের রঙ হয়ে ওঠে তাদের হাসি ঠাট্টা তামাশা কিংবা উপমা। পাতিলের তলা আর নুরু একে অন্যের সাথে যুদ্ধ করতো তাদের আলোচনায়।

ঘন্টাখানেক বাদে একজন নার্স দ্রুত পায়ে এসে নুরুর হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দেয় – তাড়াতাড়ি ওষুধগুলো নিয়ে আসেন, পেশেন্টের অবস্থা সিরিয়াস। নুরু শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কাগজের দিকে তাকিয়ে। লেখা কিছু তার বুঝে আসে না, কালির আঁকিবুঁকি সব। নার্স এবার কড়া স্বরে বলে, কি ব্যাপার এখনও দাঁড়িয়ে আছেন! যাচ্ছেন না কেন?
নুরু এবার ঝেড়ে দৌড় দেয়। দৌড়ের মাঝে তার মাথায় বিচ্ছিন্নভাবে নানা স্মৃতি খেলে যায়।

বস্তির একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়েছিল তাকে। খুব অল্প সময়ে জীবনের প্রথম বিদ্যালয় নিয়ে মনে ধারণ করা সুখকর অনুভূতিগুলো ক্রমে তার কাছে হয়ে ওঠে ভীতিকর। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন টিটকারীর স্বীকার হতে হয় তাকে। ভুত, কাইল্ল্যা বলে সম্বোধন করতো প্রায় সব বালক বালিকারা। উগ্র বালকের দল মাঝে মাঝে তাকে প্রহারও করতো সখের বশে। নুরু কখনও কোন প্রতিবাদ করতে পারে নাই। দিন দিন তার নরম মন নিজের গায়ের রঙ নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করে। একসময় সে অস্বীকৃতিও জানায় বিদ্যালয়ে যেতে। পরিবার থেকে তার এই আবদার মানা হয় না। তাকে ফিরতি প্রতিদিনই বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে হয়।
একদিন উগ্র বালকেরা যৌনাঙ্গ কতখালি কালো তা দেখার জন্যে নুরুর হাফপ্যান্ট টেনে খুলে ফেলে। সে মাটিতে পরে থাকে, চারপাশে বালক বালিকারা গোল হয়ে উৎসব দেখে। চরম অপমানিত হয়ে নুরু ঝাঁপিয়ে পরে ঘটনাকারীদের উপর। তার শক্তির সাথে কেউ পেরে ওঠে না এবং তা দেখে উপস্থিত সব বালক বালিকারা যথেষ্ট ভয় খায়। নুরুর শারীরিক শক্তি সম্পর্কে কারও ধারণা ছিল না, কোন ধারণা ছিল না তার নিজেরও। সেদিন সেখানেই সমাপ্তি ঘটে ঘটনার। নুরু ক্ষণিকের জন্য ভাবতে পারে বিদ্যালয়ে উৎপাত বন্ধের কথা। ভাবে আর হয়ত কেউ তাকে ভুত বা কাইল্ল্যা বলে ডাকবে না। কেউ আর ডাকেওনি কোনদিন। তিনদিনের দিন আড়াল আবডাল থেকে তাকে ‘হনুমান’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
বিদ্যালয়ে তারপর থেকে প্রতিদিনই তাকে হনুমান বলে ডাকা হয়। সামনাসামনি কেউ ডাকে না। নুরু দেখেওনি কাউকে ডাকতে। শুধু শুনেছে, প্রতিদিন, অসংখ্যবার, তবে সব ডাকগুলো এসেছে আড়ালাবডাল থেকে। ঘুরে তাকালে কাউকে খুঁজে পায়নি সে অথবা কারও মুখ দেখে বোঝা যায়নি। সেই বালক নুরু এরপর থেকে বিদ্যালয় পালায় কিংবা কোথাও লুকিয়ে থাকা শুরু করে। যাতে কেউ দেখতে না পারে, কারও চোখে যেন সে না পরে। স্বল্প হয়ে আসে তার শিক্ষাজীবন। একদিন আব্বার চোখে ধরা পরে যায়। জীবন বাঁচাতে নুরুকে প্রচুর ছুটতে হয় সেদিন। আজকের মতনই।

নুরু ঔষধপত্র কিনে এনে নার্সের হাতে তুলে দেয়। নার্স সেগুলো নিয়ে ছুটে ভিতরে ফেরত চলে যায়। নুরু সেখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ খালি করিডোর দেখে। ফিরে এসে বারান্দার লম্বা কাঠের আসনে দেহ ছেড়ে দিয়ে বসে থাকে খানিকটা সময়। ঘাড় ঘুরিয়ে ভাত শালিক দুইটিকে খোঁজে। কোথাও দেখা মেলে না। পৃথিবীতে এত মানুষ, অথচ কথা বলার মত মানুষ খুঁজলে পাওয়া যায় না।

সেদিনও পায়নি। নুরু তখন রিক্সা চালায়। রিক্সা চালিয়ে জীবনের সাত বছর কাটিয়ে দিয়েছে। এমন দিনগুলোর একদিন সন্ধ্যায় ফিরে এসেছে সারাদিনের অর্জিত ক্লান্তি শরীরে বয়ে। বস্তিতে ঘরের সামনে কোলাহল দেখতে পায়। জিজ্ঞাসু চোখে ঘরে ঢুকে জানতে পারে আজ তার বিবাহ। কোন ধরনের বাধায় কোন সুফল আসেনি। তার আব্বা মানেনি। বিয়ে তার আজই করতে হবে। অগত্যা মেনে নিতে হয় আব্বার সিদ্ধান্ত।

বস্তিতে বাসর রাতে তেমন কোন হেরফের হয় না পরিবেশের। আমন্ত্রিতরা খেয়ে দেয়ে যে যার মত ফিরে গিয়ে শুয়ে পরে। বর কনের মনে উত্তরকালের যতটুকু অভিনব দৃশ্যপট ঘটে ততটুকুই নতুনত্ব। নুরুর তেমন কোন খোশখেয়াল এলো না মনে। উল্টো নতুন প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কা তাকে প্রায় গিলে ফেলছিল। নুরু জানে যার সাথেই তার বিয়ে হোক না কেন তার গায়ের রং দেখামাত্র তাকে শিকার হতে হবে। কেউ মানবে না। প্রচন্ড দ্বিধা থাকলেও যেখানে যাওয়ার সেখানে যেতেই হয় মানুষকে। নুরু কাচুমাচু হয়ে নতুন বউ’র সামনে চুপ করে বসে থাকে অনেকক্ষণ। লগ্ন কেটে গেলেও মুখে কথা ফোটে না। সকল বাঁধ ভেঙ্গে কথা বলে নুরুর স্ত্রী সদ্য বিবাহিত আলেয়া – আমি যানি আপ্নে আমারে মাইনা লইবেন না।
আলেয়া আর কি বলেছিল নুরু কিছু শুনতে পায় নাই। জীবনে অনেকবার অনেকরকম ধাক্কা সে খেয়েছে, কিন্তু এমন ধাক্কা এই প্রথম। নুরুর দুইচোখে পানি উপচে আসে। জীবনে প্রথম কেউ তাকে ‘আপ্নে’ বলে সম্বোধন করেছে। কেউ তো কোনদিন তাকে সন্মান করেনি এতগুলো বছরে। জীবনের এতগুলো বছর শুধু এই প্রত্যাশা নিয়েই স্রোত বয়ে গিয়েছে যে কেউ অন্তত তাকে সন্মান করে কথা বলুক। কখনও কেউ তা বলেনি। ছোট বড় কেউ না। রিক্সা চালিয়ে জীবন নির্বাহ করার সুবাদে ছোট বড় সবাই তাকে তুই তোকারি তুমি বলে সম্বোধন করে যায়। এমনকি বিদ্যালয় পড়ুয়া বাচ্চারাও ডেকে বলে – ওই মামা, যাইবা? কেউ তাকে কখনও ভুল করেও ‘আপনি’ বলেনি।
নুরুর কান্নার ফ্যাঁচফ্যাঁচ শব্দে আলেয়া নিজেই ঘোমটা সরিয়ে মুখ তুললো। তারপর যেন দুইজন দুইজনের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিল অনন্তকাল। আর কোন মৌখিক কথা হল না। বোঝাপড়া যা হল তা মনে মনে। এখানে পৃথিবীতে বস্তির ছোট্ট একটি ঘরে একটিবার গায়ের রঙের গর্ব নিভে গেল চিরতরে। নুরু আর আলেয়ার শরীরের রঙ একই রকম কালো। আলেয়া যেমন করে নুরুকে সন্মান প্রদর্শন করলো, নুরুও তেমন আলেয়াকে বুকে টেনে নিল। আলেয়াও যা কখনও আশা করেনি।

বিয়ের কয়েকবর্ষ পর নুরুর জীবনে খুব ধীরে কিছু মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আসে। সিন্ধান্ত নেয় আর সে রিক্সা চালাবে না। খেটে খাওয়ার মত যথেষ্ট শক্তি গচ্ছিত আছে তার শরীরে। অন্য কোন খেটে খাওয়ার কাজ করবে। আধবেলা রিক্সা চালায় আর আধবেলা খরচ করে নতুন কাজের সন্ধানে।
মাসের পর মাস চলে যায় কিন্তু চাকরি নামক কিছু তার জীবনে হাজির হয় না। এমন সময় একদিন সে একটি ক্ষ্যাপ নিয়ে এক যাত্রীকে নামিয়ে দেয় সদ্য নির্মিত শিশুমেলার প্রধান ফটকে। আরোহীকে পাওনা টাকা ফেরত দিতে দিতে প্রধান ফটকের একটি কাগজে চোখ আটকে যায়। “জরুরী – কর্মচারী আবশ্যক”।
বস্তিতে ফিরে পোষাক পাল্টে যখন সে চাকরীর জন্যে সাক্ষাৎকার দিতে আসে তখন সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী তার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। কেমন একটু হাসেও, তারপর জিজ্ঞেস করে,
কি কাজ করবা?
যে কোন কাজ।
যে কোন ক্যামন কাজ?
আপনারা যেইডা দেবেন
কাজ কাম তো ত্যামন নাই এখন
যদি কোন একটা কাজে রাখতে পারেন আমারে ভাল হইত
ডর দেখাইতে পারবা?
ডর?
হ মিয়া, ডর
ক্যামনে
অই যে গুহা দেখতে আছো অইডার ভিত্রে দিয়া ট্রেন চলবে, তুমি থাকবা ঐ গুহার ভিত্রে, তোমার সামনে দিয়া ট্রেন যাওনের সময় তুমি পোলাপাইন গো ডর দেখাইবা। সোজা কাম, কঠিন কিছু না।
জে পারবো।
এইতো তাইলে তোমার চাকরী হইয়া গেল। খাড়াও তোমারে তোমার উনিফর্মডা দেখাই, মজার উনিফর্ম মিয়া।

একজনকে আদেশ করতে সে ইউনিফর্মটি নিয়ে এলো। সেটা যখন খুলে মেলে ধরা হল নুরু কুচকুচে কালো ছাড়া আর কিছু ঠাহর করতে পারলো না। তাই জিজ্ঞেস করলো – কি এটা?
লোকটি তাকে বলল, তোমার উনিফর্ম মিয়া, হনুমান। তুমি হনুমান সাইযা বইয়া থাকবা, পোলাপাইন নিয়া ট্রেন আগাইয়া আসলেই ঝাঁপাইয়া পইরা ডর দেখাইবা। এই তোমার কাম। আইজ থেইকা এই শিশুমেলার হনুমান তুমি।
এতকাল পরেও হনুমান নুরুর পিছ ছাড়ে নাই। নুরুও তাই এবার হনুমানকে আপন করে নেয়। শুরু হয় তার চাকরী জীবন। চাকরীর সংবাদে খুশী হয় নুরুর বউ। এটাই তার জীবনের বড় পাওয়া। তবে বরাবর কিছু পাওয়ার ছলে জীবন কিছু তুলে নেয়।
তৃতীয় দিন নুরু ফিরে এলো ফোলা নাক নিয়ে, তারপর একদিন ফাটা কান নিয়ে, একদিন ট্যামা মাথা নিয়ে। দর্শনার্থীরা প্রায় প্রতিদিন কেউ না কেউ হাতে করে কিছু নিয়ে আসে। হনুমান যদি ভয় না দেখায়ও তবুও তারা ক্ষান্ত হয় না। কেউ বোতল ছুঁরে পারে, কেউ মারে ইটপাটকেল, কেউবা লাঠি দিয়ে খোঁচায়, মারে, আঘাত করে যায়। ফলে হনুমান যখন কাতরায় কিংবা ব্যাথা পায় বা না পায় দর্শনার্থীরা সবকিছুতেই আনন্দ পায়। টিকিট টেকে এসেছে আনন্দ উপভোগ করাটাই তাদের উদ্দেশ্য। এমন একদিন দাঁতের গোঁড়ায় জমা রক্ত নিয়ে ফিরে এসে নুরু জানতে পারে তার বউকে হাসপাতালে নিতে হবে এখনই।

সাত নম্বর ওয়ার্ডের দরজার উল্টো দিকের বেঞ্চিতে নুরু ঘুমিয়ে পরেছিল। হঠাৎ ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। তাকিয়ে দেখতে পেল একজন বৃদ্ধ প্রায় তার মুখের উপর ঝুঁকে আছে। নুরু প্রথমে কিছুটা হকচকিয়ে গেল তারপর সামলে নিল নিজেকে। সম্পূর্ণ পাঁকা চুল দাঁড়ির বৃদ্ধ কিছু একটা অবশ্যই বলবে তাই নুরু তাকিয়ে আছে বৃদ্ধের দিকে, তেমনি বৃদ্ধ নুরুর দিকে। অবশেষে বৃদ্ধ কিছু বলছে না দেখে নুরু মাথা ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে – কি?
বৃদ্ধ নুরুকে অবাক করে দিয়ে পাল্টা জিজ্ঞেস করেন, আমি কোথায় যাবো?
নুরু তিনবার পলক ফেলে উল্টো জিজ্ঞেস করে, কোই যাইবেন?
বৃদ্ধ জানায়, তুমি বলো।
নুরু হতবম্ব হয়ে জানতে চায়, বাসাত যাইবেন?
বৃদ্ধ হেসে বলে, আচ্ছা যাই। তুমি যাবা?
নুরু মাথা নেড়ে না জানাতে বৃদ্ধ চলে যাচ্ছে তখন নুরুর খেয়াল হয় বৃদ্ধের হয়ত মাথার ঠিক নেই। হালকা নীল একটি লুঙ্গি আর সেন্টু গেঞ্জি গায় দিয়া কে বাসায় যায়! ততক্ষণে নুরুর চোখের আড়ালে চলে গেছেন বৃদ্ধ। নুরু পিছু নেয়ার চেষ্টা করলো। কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না তাকে। এক সময় খুঁজতে খুঁজতে হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে এলো। তখন দেখতে পাওয়া গেল বৃদ্ধকে। ভ্যান গাড়ির এক চায়ের দোকানদারের সাথে কথা বলছে। তারপর তাকে ফিরে আসতে দেখলো। বৃদ্ধ কাছাকাছি ফিরে এলে নুরু দেখতে পেল বৃদ্ধের লুঙ্গিতে হাটু বরাবর কাদার ছাপ, হাতেও কাদা লেগেছিল যা বৃদ্ধ তার গায়ের গেঞ্জিতে মুছেছেন। নুরু জানতে চায়, কাদা লাগাইছেন ক্যামনে?
বৃদ্ধ কেমন হাসিতে জবাব দিল, পড়ে গেছিলাম। ব্যাথা পাইছি।
এই হাসি সাধারণ হাসি না। নুরুর বুকের ভিতরটা শুকিয়ে যায় হাসি দেখে। কেমন ভয় ভয়ও হয়। তথাপি জানতে চায়, কোই যাইতাছেন?
বৃদ্ধ থামে, পিছন ফিরে জবাব দেয় – বাসায়।
নুরু শুকনো মুখে পাল্টা প্রশ্ন করতে পারে – আপনের বাসা ওদিক?
বৃদ্ধ চাওয়ালাকে ইঙ্গিত করে জানায়, ও তো বলল এদিকে।
ইতিমধ্যে শুকনা পাতলা একটি ছেলে ছুটে এসে বৃদ্ধের বাহু ধরে বলে, কোথায় গেছিলা আব্বা? আমি তোমারে সব জায়গায় খুঁজতেছি। চল ঘুমাবা। বলে হাত বাড়িয়ে দেয়। বৃদ্ধও ছেলের হাত শক্ত করে চেপে ধরে। নুরু প্রতিটি আঙ্গুল মনযোগ দিয়ে দেখে।
ছেলেটি বৃদ্ধকে ধীরে যত্ন সহকারে নিয়ে যায়। নুরু সেদিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। সে কখনও তার আব্বার হাত ধরার সাহস পায় নাই। আব্বা মরে যাওয়ার পরেও না।

সেই বেঞ্চটিতেই বাকি রাত ঘুমিয়ে কাটায় নুরু। খুব একটা স্বপ্ন দেখে সে। বউ আর ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। বস্তিতে ঘরে ঢুকে দেখতে পায় সে নিজে তার আব্বার কোলে বসে খেলছে। আব্বা আদর করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এমন অবস্থায় সে ভয়ে আব্বার কোলে বসেই কেঁদে ফেলে। সেই কান্না দেখে নুরুর কোলে নুরুর ছেলেও কেঁদে ফেলে তাকে জিজ্ঞেস করে – “আব্বু, তুমি কান্না করতেছ যে”? এমন সময় বাইরে উচ্চ কর্কষ ‘চিড়িক’ ‘চিড়িক’ ধ্বনিতে ঘুম ভেঙ্গে যায় নুরুর। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে চোখ ঘষে ঘুম তাড়ায়। বাইরে তাকিয়ে একটি ভাত শালিককে দেখতে পায়। প্রচন্ড ডেকে যাচ্ছে আজ। বেঞ্চ ছেড়ে উঠতে যাবে এমন সময় অন্য ভাত শালিকটিকেও দেখতে পায়। মৃত অবস্থায় পরে আছে নারী শালিকটির কাছেই। নুরুর মন কেমন হুহু করে ওঠে।
প্রাতঃকর্ম শেষে যখন সে আবার হাসপাতালের বারান্দার আসনে ফিরে আসে তখন একজন নার্স উচ্চস্বরে তার নাম ধরে ডেকে যাচ্ছে। নার্স প্রথমে তাকে শক্ত হতে বলে তারপর জানায় আলেয়া মারা গেছে। সে যেন বকেয়া সব খরচ পরিশোধ করে ডাক্তারের কাছ থেকে মৃত্যুপত্র সংগ্রহ করে নেয়। সময় যেন নষ্ট না করে।
নুরু তিনবার পলক ফেলে শুধু, তারপর জানতে চায় “ক্যামনে”? আর কিছু বলতে পারে না।
নার্স জানায় ‘পোষ্টপার্টাম হেমারেজ’। নুরুর দুই ঠোঁটের দূরুত্ব শুধু বাড়ে একটু, এছাড়া কিছু বোধগম্য হয় না। নার্স এবার বলে ‘ইউটেরাইন অ্যাটনি’। তবুও সে বুঝতে পারেনা, মাথা নিচু করে ফেলে। নার্স ফিরে যায়।

নুরু তার বাচ্চাটিকে দেখতে যায়। একজন নার্স দেখিয়ে দেয় পথ। পাশাপাশি ছয়টি বাচ্চা রাখা। তবে আশ্চর্য, নুরুর নিজের ছেলেকে চিনতে পারে না। সে ভেবেছিলে এখানে এসে অবিকল তার সংক্ষিপ্ত রূপ দেখতে পাবে যা কিনা হবে অপরিবর্তনীয় চির আপণ তার গায়ের রঙে তৈরি। ফুটফুটে ফর্সা একটি বাচ্চাকে দেখিয়ে দেয় নার্স। জানায় এটিই তার সন্তান।
পরক্ষণে তার হাজার হাজার মানুষের মুখ মনে পরে। সে নিজেকে একদিকে আর বাকি সবাইকে তার বিপরীত পাশে দেখতে পায়। আপন মনে বিড়বিড় করে ওঠে – নিজেরডা মানছি পোলারডা মানতে পারুম না।

মিনিট পাঁচেক পর নুরুকে নিঃশব্দে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। একা।

© Shihab Shahariare Khan || developed by digibinary ||